মঙ্গলবার, ২৫ জানুয়ারী ২০২২, ০৮:২১ অপরাহ্ন

২৫ দিনে করোনায় মৃত্যু দ্বিগুণ, পরিমাণ বাড়লেও কমেছে হার

বিশেষ প্রতিবেদকঃ মোহাম্মদ অলিদ সিদ্দিকী তালুকদার
  • প্রকাশ : সোমবার, ৬ জুলাই, ২০২০
  • ২৬৬

দেশে নভেল করোনাভাইরাসের (কোভিড-১৯) সংক্রমণ শনাক্তের ঠিক ১২০ দিনের মাথায় এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে দুই হাজার মানুষের মৃত্যু হলো। তবে করোনায় আক্রান্ত হয়ে প্রথম মৃত্যুর ঘটনার পর দুই হাজার মৃত্যুর ঘটনা ঘটলো ১১০ দিনের মাথায়। এর মধ্যে শেষ ২৫ দিনেই মারা গেছেন এক হাজার কোভিড রোগী। সব মিলিয়ে আজ রোববার (৫ জুলাই) দেশে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর সংখ্যা দুই হাজার ৫২।

এদিকে, বিশ্বব্যাপী করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর হার ৪ দশমিক ৬৮ শতাংশ হলেও বাংলাদেশে এই হার উল্লেখযোগ্য পরিমাণে কম। রোববার পর্যন্ত স্বাস্থ্য অধিদফতরের তথ্য বলছে, দেশে করোনাভাইরাসে আক্রান্তের সংখ্যা ১ লাখ ৬২ হাজার ৪১৭ জন। সে হিসাবে বাংলাদেশে সংক্রমণ শনাক্ত বিবেচনায় মৃত্যুর হার ১ দশমিক ২৬ শতাংশ। তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, প্রথম ৯৫ দিনে এক হাজার মৃত্যুর সময় এই হার ছিল ১ দশমিক ৪১ শতাংশ। তবে পরে মাত্র ২৫ দিনেই করোনার কারণে এক হাজার মৃত্যু ঘটলেও মৃত্যুহার ১ দশমিক ১৪ শতাংশ।

করোনায় মৃত্যুর পরিসংখ্যানঃ

গত ৮ মার্চ দেশে প্রথম করোনাভাইরাসে আক্রান্ত কোনো ব্যক্তি শনাক্ত হন। এরপর করোনাভাইরাসে আক্রান্ত প্রথম কোনো ব্যক্তি ১৮ মার্চ মারা যান বলে জানায় জাতীয় রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর)। শুরুর দিকে করোনার সংক্রমণ ও মৃত্যুর মাত্রা ছিল বেশ কম। এর মধ্যে ১৫ এপ্রিল, করোনায় প্রথম মৃত্যুর ২৯ দিনের মাথায় ৫০তম কোভিড পজিটিভ ব্যক্তি মারা যান। একশ মৃত্যুর রেকর্ড পাওয়া যায় এর মাত্র পাঁচ দিন পর, ২০ এপ্রিল। এরপর প্রথম মৃত্যুর ৬৯ দিনের মাথায় গত ২৫ মে ৫০০তম মৃত্যুর ঘটনা ঘটে।

করোনায় আক্রান্ত হয়ে পাঁচশ থেকে হাজার— অর্থাৎ দ্বিতীয় ৫০০ মৃত্যুতে সময় লাগে মাত্র ১৬ দিন। দিনটি ছিল ১০ জুন। এর পরের ৫০০ মৃত্যুতে সময় লাগে আরও কম— ১২ দিন। ২২ জুন দেড় হাজার মৃত্যু পেরিয়ে যায় দেশে। এরপর আজ দুই হাজার মৃত্যুও অতিক্রান্ত হলো। তাতে শেষ পাঁচশ মৃত্যু হয়েছে ১৩ দিনে।

মাসভিত্তিক মৃত্যু হিসাবঃ

মার্চ মাসে করোনায় আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর সংখ্যা ছিল ৫। পরের মাস এপ্রিলে মারা যান ১৬৩ জন। মে মাসে এপ্রিলেরও প্রায় তিন গুণ কোভিড রোগীর মৃত্যু হয়। ওই মাসে ৪৮২ জন মারা যান করোনায় আক্রান্ত হয়ে। জুন মাসে আবার মে মাসের তুলনায় প্রায় আড়াই গুণ কোভিড রোগীর মৃত্যু হয়। পরিমাণ ছিল ১ হাজার ১৯৭ জন। এখন পর্যন্ত করোনায় মোট মৃত্যুর প্রায় ৫৮ ভাগই ঘটেছে জুন মাসে। আর জুলাইয়ের প্রথম পাঁচ দিনে মারা গেছেন ২০৫ জন।

মাসভিত্তিক হিসাবে দেখা যায়, এপ্রিলে গড়ে প্রতিদিন পাঁচ জনেরও বেশি মারা গেছেন। মে মাসে এই সংখ্যা ছিল ১৫ জনেরও বেশি। আর জুনে প্রতিদিন গড়ে ৪০ জন করে মারা গেছেন করোনায় আক্রান্ত হয়েছে।

বয়সভিত্তিক মৃত্যুর পরিসংখ্যানঃ

স্বাস্থ্য অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত করোনায় আক্রান্ত হয়ে যারা মারা গেছেন, তার ৪০ শতাংশেরও বেশি মানুষের বয়স ৬০ বছরের বেশি। এই বয়সী মোট ৮৯০ জন এখন পর্যন্ত মারা গেছেন, যা মোট মৃত্যুর ৪৩ দশমিক ৪১ শতাংশ। এছাড়া ৫১ থেকে ৬০ বছর বয়সী আরও ৫৯৩ জন মারা গেছেন, যা মোট মৃত্যু ২৮ দশমিক ৯২ শতাংশ। সে হিসাবে করোনায় মোট মৃত্যুর প্রায় চার ভাগের তিন ভাগ, সুনির্দিষ্ট করে বললে ৭২ দশমিক ৩৪ শতাংশের বয়সই ৫০ বছরের বেশি।

এর বাইরে ৪১ থেকে ৫০ বছর বয়সী ৩১১ জন (১৫ দশমিক ১৬ শতাংশ), ৩১ থেকে ৪০ বয়সী ১৫১ জন (৭ দশমিক ৩৬ শতাংশ), ২১ থেকে ৩০ বছর বয়সী ৭০ জন (৩ দশমিক ৫১ শতাংশ), ১১ থেকে ২০ বছর বয়সী ২৪ জন (১ দশমিক ২০ শতাংশ) ও ১০ বছরের কম বয়সী ১৩ জন (শূন্য দশমিক ৬৩ শতাংশ) মারা গেছেন করোনায় আক্রান্ত হয়ে। সে হিসাবে ৩০ বছরের চেয়ে কম বয়সী করোনায় আক্রান্তদের মধ্যে মৃত্যুর হার ৫ দশমিক ২১ শতাংশ।

বিভাগভিত্তিক মৃত্যুর পরিসংখ্যাঃ

শুরু থেকেই করোনাভাইরাস সংক্রমণের হটস্পট ছিল রাজধানী ঢাকা। সংক্রমণের সংখ্যা যেমন, মৃত্যুর সংখ্যাতেও তেমনি এগিয়ে এই ঢাকা শহর। সে কারণে ঢাকা বিভাগে করোনায় আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। স্বাস্থ্য অধিদফতরের তথ্য বলছে, ঢাকা বিভাগে এখন পর্যন্ত মারা গেছেন অর্ধেকেরও বেশি— এক হাজার ৬০ জন। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৫৩৪ জন মারা গেছেন চট্টগ্রাম বিভাগে। এছাড়া রাজশাহী বিভাগে ১০২ জন, খুলনা বিভাগে ৮৮ জন, সিলেট বিভাগে ৮৬ জন, বরিশাল বিভাগে ৭২ জন, রংপুর বিভাগে ৬১ জন ও ময়মনসিংহ বিভাগে ৪৯ জন মারা গেছেন করোনায় আক্রান্ত হয়ে।

মৃত্যুর হার কমছে
স্বাস্থ্য অধিদফতরের তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, মার্চ মাসে করোনা শনাক্তের পরিমাণের বিপরীতে মৃত্যুর হার ছিল অনেক বেশি— ৯ দশমিক ৮০ শতাংশ। তবে করোনা শনাক্তের পরীক্ষা আর সংক্রমণ— দু’টোই বাড়তে থাকায় মৃত্যুর হার কমে আসে এপ্রিলে। ওই মাসে সংক্রমণ শনাক্তের বিপরীতে মৃত্যুর হার ছিল ২ দশমিক ১৪ শতাংশ। মে ও জুন মাসে সংক্রমণ বিবেচনায় মৃত্যুর হার ছিল স্থিতিশীল— মে মাসে ১ দশমিক ২২ শতাংশ ও জুন মাসে ১ দশমিক ২১ শতাংশ। এই দুই মাসেই বর্তমানে মোট সংক্রমণ বিপরীতে মৃত্যুর হার ১ দশমিক ২৬ শতাংশের চেয়ে কম।

মৃত্যুর হারের ক্রমহ্রাসমান প্রবণতা স্পষ্ট হয় প্রতি ৫০০ মৃত্যুর পরিসংখ্যান বিশ্লেষণেও। ২৫ মে যখন ৫০০ মৃত্যুর সীমা অতিক্রান্ত হলো (৫০১ জন), ওই দিন দেশে করোনায় আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ৩৫ হাজার ৫৮৫। সে হিসাবে ওই দিন পর্যন্ত, অর্থাৎ সংক্রমণ শুরুর প্রথম ৭৯ দিনে শনাক্ত বিবেচনায় মৃত্যুর হার ছিল ১ দশমিক ৪০ শতাংশ। এরপর ১০ জুন পর্যন্ত ১৬ দিনে মারা যান আরও ৫১১ জন। ওই ১৬ দিনে মৃত্যুর হার ছিল ১ দশমিক ৩০ শতাংশ।

করোনায় আক্রান্ত হয়ে আরও পাঁচ শতাধিক মৃত্যু ঘটে ১১ জুন থেকে ২৩ ‍জুনের মধ্যে। এই ১৩ দিনে ৫৩৩ জন মারা যান দেশে। একই সময়ে সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছিল ৪৪ হাজার ৩৩৩ জনের শরীরে। এই ১৩ দিনে সংক্রমণের বিপরীতে মৃত্যুহার ছিল ১ দশমিক ২০ শতাংশ। আর ২৪ জুন থেকে আজ ৫ জুলাই পর্যন্ত করোনায় মৃত্যু হয়েছে ৫০৭ জনের।এই সময়ে সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে ৪৩ হজার ২১৯টি। এই ১২ দিনে সংক্রমণের বিপরীতে মৃত্যুর হার ১ দশমিক ১৭ শতাংশ।

অন্যদিকে আগেই বলা হয়েছে, প্রথম এক হাজার মৃত্যুর সময় সংক্রমণ শনাক্তের বিপরীতে মৃত্যুর হার ছিল ১ দশমিক ৪১ শতাংশ। আর পরের হাজার মৃত্যুতে মৃত্যুহার ১ দশমিক ১৪ শতাংশ।

বিশেষজ্ঞরা কী বলছেন?
কোভিড প্রতিরোধ বিষয়ক জাতীয় পরামর্শক টেকনিক্যাল কমিটির সদস্য ভাইরোলজিস্ট ডা. নজরুল ইসলাম এইচ টিভিকে বলেন, একটা বিষয় হতে পারে যে কোভিডের বিরুদ্ধে আমাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা আগের চেয়ে কিছুটা হলেও উন্নত হয়েছে। শুরুর দিকে বেশকিছু অব্যবস্থাপনা ছিল, অস্বীকার করার উপায় নেই। এখনো যে স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা পুরোপুরি সন্তোষজনক, তা নয়। তবে আগের চেয়ে কিছুটা ভালো অবস্থা তো বটেই। তাছাড়া বেসরকারি অনেক প্রতিষ্ঠানেও কোভিডের চিকিৎসা হচ্ছে। সেখানেও মানুষ সেবা পাচ্ছে।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) সাবেক এই উপাচার্য আরও বলেন, আরেকটি বিষয় হলো— কোভিড রোগটি সবার কাছেই ছিল একেবারে নতুন। ফলে শুরুতে চিকিৎসকরাও কিছুটা হলেও সময় নিয়েছেন এই রোগে আক্রান্তদের চিকিৎসা দিতে। ধীরে ধীরে কিন্তু তারা বিষয়টিতে পুরোপুরি অভ্যস্ত হয়েছেন। তারা এখন কোভিডের খুঁটিনাটি সবই জানেন। ফলে এখন আগের চেয়ে ভালো চিকিৎসা দিতে পারছেন। মৃত্যুহার কিছুটা হলেও কমার পেছনে এগুলো কারণ হিসেবে কাজ করতে পারে। তবে আরও গবেষণা ছাড়া সুনির্দিষ্টভাবে কিছু বলা যাচ্ছে না।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সেন্টারের (এমআইএস) প্রধান ও স্বাস্থ্য অধিদফতরের মিডিয়া সেলের সভাপতি ডা. হাবিবুর রহমান গণমাধ্যমে বলেন, প্রথম দিকে চিকিৎসা ব্যবস্থাপনায় কিছু ঘাটতি ছিল। কিন্তু এখন আইসিইউ বা ভেন্টিলেশন সুবিধার সবই পর্যাপ্ত রয়েছে। ফলে এখন আগের চেয়ে চিকিৎসার সুযোগ অনেকটাই উন্নত হয়েছে। এ কারণে মৃত্যুহার এখন কিছুটা কম হতে পারে।

Share This Post

আরও পড়ুন