মঙ্গলবার, ২৫ জানুয়ারী ২০২২, ০৮:৩৫ অপরাহ্ন

সরকারি চাকরি ছেড়ে দাপুটে আফতাব

বিশেষ প্রতিবেদকঃ মোহাম্মদ অলিদ সিদ্দিকী তালুকদার
  • প্রকাশ : বুধবার, ২২ জুলাই, ২০২০
  • ২৪৯

ফরিদপুরের বোয়ালমারী উপজেলার চতুল গ্রামের মোল্লা পরিবারের সন্তান মো. আফতাব আহমেদ। বাবা আবদুল ওহাব মোল্লা। স্থানীয়দের কাছে ‘সচিব আফতাব মোল্লা’ নামে পরিচিত আফতাব আহমেদ। এলাকায় দান-খয়রাতসহ সামাজসেবায় তার বেশ খ্যাতি।

বছর দশেক আগে সরকারি চাকরি থেকে অবসর নেওয়া এ ব্যক্তির আয়ের উৎস কী এলাকার মানুষের তেমন জানা নেই। চতুল গ্রামের এ আফতাব মোল্লা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ঠিকাদার চক্রের অন্যতম প্রতাপশালী সদস্য। তার বিরুদ্ধে সম্প্রতি দুর্নীতি দমন কমিশন দুটি মামলা করেছে। আরও অনুসন্ধান চলমান আছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, করোনাকালে স্বাস্থ্য খাতের নাজুক অবস্থা প্রকাশ্যে এসেছে। আর এ নাজুক অবস্থার জন্য মূলত দায়ী একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট। যার একজন এ আফতাব মোল্লা। তিনি মেসার্স এএসএল নামে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও)। দুদকের সুপারিশের পর গত ৯ জুলাই স্বাস্থ্য অধিদপ্তর যে ১৪ প্রতিষ্ঠানকে কালো তালিকাভুক্ত করেছে মেসার্স এএসএল তার একটি।
এএসএলের এমডি ও সিইও আফতাবসহ সাতজনের বিরুদ্ধে গত বছর ২৫ নভেম্বর চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালের যন্ত্রপাতি সরবরাহে ৯ কোটি ১৫ লাখ ৩০ হাজার ৪২৫ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে মামলা হয়। ওই মামলার বাদী দুদকের সহকারী পরিচালক মোহাম্মদ সিরাজুল হক। মামলার এজাহারে বলা হয়, আরআইয়ের যন্ত্রের প্রচলিত বাজারমূল্য ২ কোটি ৮০ লাখ টাকা হলেও সেটা কিনতে ব্যয় দেখানো হয়েছে ৯ কোটি ৯৫ লাখ ৫০ হাজার টাকা। চারটি কালার ডপলারের বাজারমূল্য ১ কোটি ৮ লাখ ৮০ হাজার টাকা হলেও ব্যয় দেখানো হয়েছে ২ কোটি ৬০ লাখ টাকা। হাসপাতালটির জন্য কেনা আটটি পেশেন্ট মনিটরের বাজারমূল্য ২৫ লাখ ৫৮ হাজার ৭২০ টাকা হলেও দাম দেখানো হয়েছে ১ কোটি ৫ লাখ ৬০ হাজার টাকা। এভাবে বিভিন্ন যন্ত্রপাতি সরবরাহের মাধ্যমে সাত আসামির বিরুদ্ধে মোট ৯ কোটি ১৫ লাখ ৩০ হাজার ৪২৫ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ আনে কমিশন।

এছাড়া গত ১৯ মার্চ শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের যন্ত্রপাতি সরবরাহে দুর্নীতির অভিযোগে মেসার্স এএসএলের আফতাব আহমেদ ও হাসপাতালটির পরিচালকের বিরুদ্ধে মামলা করেছে দুদক। এ মামলায় ২০১৭-১৮ ও ২০১৮-১৯ অর্থবছরে কেনাকাটায় প্রায় ১৩ কোটি ১৮ লাখ টাকার দুর্নীতির অভিযোগ আনা হয়। মামলার বাদী দুদকের সহকারী পরিচালক মামুনুর রশীদ চৌধুরী। এজাহারে বলা হয়, মেসার্স এএসএলের স্বত্বাধিকারী আফতাব আহমেদ ও হাসপাতালটির পরিচালকের যোগসাজশে দুর্নীতি এবং ক্ষমতার অপব্যবহার করে সাজানো দরপত্রের মাধ্যমে ৩১টি ভারী যন্ত্রপাতি ক্রয়ে প্রকৃত দামের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি দাম দেখানো হয়েছে।

সম্প্রতি সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে যন্ত্রপাতি সরবরাহে অনিয়মের অভিযোগ অনুসন্ধানের পর দুদকের অনুসন্ধান প্রতিবেদনে বলা হয়, সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের ভারী যন্ত্রপাতি ক্রয়ের ক্ষেত্রে পরিচালক তার নির্ধারিত আর্থিক ক্ষমতাসীমার অতিরিক্ত অর্থ দিয়ে যন্ত্রপাতি কেনেন। তিনি রাজস্ব, উন্নয়ন ও থোক বরাদ্দ বাজেটের অর্থ দিয়ে ভারী যন্ত্রপাতি ক্রয়ের পৃথক দুটি উন্মুক্ত দরপত্র আহ্বান করেন। দরপত্রে যন্ত্রপাতির পদ (আইটেম) ভিত্তিক দর চাওয়া হয়। মেডিকেলের যন্ত্রপাতির সরবরাহকারী প্রকৃত ঠিকাদারদের দরপত্রে অংশ নেওয়ার সুযোগ না দিয়ে মধ্যস্বত্বভোগী ঠিকাদারদের সঙ্গে যোগসাজশ করা হয়। বাজারদরের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি দামে পদভিত্তিক দর গ্রহণ করেন পরিচালক। দরদাতার দাখিল করা দরের সঙ্গে কথিত বাজারদরের তুলনামূলক বিবরণী তৈরি করে ‘সর্বনিম্ন দরদাতার’ সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় চুক্তি করে কার্যাদেশ দেন। পরিচালক নিজেই দরপত্র মূল্যায়ন কমিটির সভাপতি ছিলেন। তিনি প্রতিষ্ঠান প্রধান হিসেবে যন্ত্রপাতির মূল্য বাজারদরের কয়েকগুণ বেশি হওয়া সত্ত্বেও এবং তা নিজের ক্রয়সীমার মধ্যে না থাকার পরও ঠিকাদারকে কার্যাদেশ দেন। ঠিকাদার কার্যাদেশ পেয়ে অন্যের কাছ থেকে যন্ত্রপাতি কিনে সেটা হাসপাতালে সরবরাহ করে।

অনুসন্ধান প্রতিবেদন অনুযায়ী প্রতিটি ইনফিউশন পাম্পের বাজারদর ৮৩ হাজার টাকা হলেও দুটি ইনফিউশন পাম্প ৩ লাখ ৪৮ হাজার টাকা করে কিনে মোট ৫ লাখ ৩০ হাজার টাকা আত্মসাৎ করা হয়। ২ লাখ ৭০ হাজার টাকা দামের স্প্রিং পাম্প ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা করে ১৯টি মেশিনে ৫১ লাখ ৩০ হাজার টাকা, ১১ লাখ ৯০ হাজার টাকা দামের হেমোডায়ালাইসিস ইলেকট্রেক বেড ৪২ লাখ ১০ হাজার টাকা করে তিনটিতে অতিরিক্ত ৯০ লাখ ৬০ হাজার টাকায় সরবরাহ করে। এভাবে ২০১৭ সালের ২৭ ডিসেম্বর থেকে ২০১৮ সালের ৬ জুন পর্যন্ত ২৬ ধরনের যন্ত্রপাতিতে অতিরিক্ত দর দিয়ে মোট ১৬ কোটি ১১ লাখ ৮ হাজার ৬০০ টাকা সরকারের আর্থিক ক্ষতির মাধ্যমে আত্মসাৎ করা হয়। একইভাবে ২০১৭-১৮ ও ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স এএসএলের আফতাব আহমেদ ৪৭ লাখ টাকার হারমনিক স্ক্যালফিল অ্যান্ড এনসেল প্রতিটি ৯৯ লাখ টাকা করে তিনটিতে অতিরিক্ত ১ কোটি ৫৬ লাখ টাকা, ৯৫ লাখ টাকা দামের এইচডি কলোনোস্কপ মেশিন ১ কোটি ৬৬ লাখ ৯৪ হাজার ৪০০ টাকা করে তিনটিতে অতিরিক্ত ২ কোটি ১৫ লাখ ৮৩ হাজার টাকা, প্রতিটি ২১ লাখ ৫০ হাজার টাকা দামের এনেসথেশিয়া মেডিশন উইথ ভেন্টিলেটর ৭৫ লাখ টাকা করে চারটিতে অতিরিক্ত ২ কোটি ১৪ লাখ টাকা, ১ কোটি ৬ লাখ টাকা দামের ডিজিটাল এক্স-রে মেশিনে ১ কোটি ৯৯ লাখ টাকা দর দিয়ে অতিরিক্ত ৯৩ লাখ ৮১ হাজার টাকা, ৩৫ লাখ টাকা দামের আল্ট্রা সাউন্ড মেশিন ৬১ লাখ ৪০ হাজার টাকায়, ৬৫ লাখ টাকার ইকো ফোর ডি মেশিন ৯৭ লাখ টাকায়, ৭৭ লাখ টাকার সার্জিক্যাল ইঅ্যান্ডটি অপারেটিং জুম মেশিন প্রায় ২ কোটি টাকায় দর দেন। এভাবে ঠিকাদার আফতাব আহমেদ ১৫ ধরনের সরঞ্জামে অতিরিক্ত ১৪ কোটি ১৪ লাখ টাকা আত্মসাৎ করেন। দুদকের উপপরিচালক মো. সামসুল আলমের নেতৃত্বে ছয় সদস্যের অনুসন্ধান দল মেসার্স এএসএল, মেসার্স আহমেদ এন্টারপ্রাইজ ও মেসার্স আরসিএসের বিরুদ্ধে পৃথক তিন মামলার সুপারিশ করে।
অনুসন্ধান দলের অন্য এক কর্মকর্তা গণমাধ্যমে বলেন, ‘আফতাব খুবই প্রতাপশালী ব্যক্তি বলে অনুসন্ধানকালে আমাদের কাছে মনে হয়েছে। তার বিরুদ্ধে মামলা না করার জন্য বিভিন্ন মহল থেকে নানামুখী চাপ আসে। কিন্তু কমিশন এসব চাপের কাছে নতিস্বীকার না করে মামলা করেছে এবং আরও মামলা প্রক্রিয়াধীন রেখেছে। ’

আফতাবের এ ক্ষমতার উৎস কী জানতে চাইলে তার ঘনিষ্ঠ একাধিক ব্যক্তি গণমাধ্যমে জানান, আফতাব আহমেদ একসময় জ্যেষ্ঠ সহকারী সচিব ছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তার ক্লাসমেট ও ব্যাচমেট ছিলেন স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব। এছাড়াও তার ব্যাচমেট আরও অনেক কর্মকর্তা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরে কর্মরত ছিলেন। মূলত তাদের সহযোগিতায় আফতাব স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন প্রতিষ্ঠানগুলোতে ঠিকাদারির একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করেন।
এছাড়া তার এক অভিনেত্রী আত্মীয়র প্রভাবও কাজে লাগান। এএসএল ছাড়াও তার আরও বেনামি প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যেগুলো তিনি ঠিকাদারি বাগিয়ে নিতে কাজে লাগান। তবে কেউ কেউ বলছেন, আফতাব সিনিয়র সহকারী সচিব নন বরং শিল্পকলা একাডেমির জেলা পর্যায়ের কর্মকর্তা ছিলেন। সরকারি চাকরি ছেড়ে পরে ঠিকাদারি ব্যবসা শুরু করেন।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে মেসার্স এএসএলের এমডি ও সিইও আফতাব আহমদ গতকাল মঙ্গলবার টেলিফোনে এইচ টিভিকে বলেন, ‘আমি গত আট বছর ধরে ব্যবসা করি। আমি কত টাকা ব্যবসা করেছি সেটা মুখ্য বিষয় নয়। আমি যেসব যন্ত্রপাতি সরবরাহ করেছি তার সবই জাপানি এবং উন্নতমানের। আমার সরবরাহ করা সব মেশিন এখনো চলছে এবং আমি নিয়মিত সেবা দিয়ে যাচ্ছি। আমি কখনো চায়না মেশিন এনে জার্মানি বা জাপানি মেশিন হিসেবে সরবরাহ করিনি বা মেশিন না দিয়ে বিল তুলে নিইনি। ’

তিনি আরও বলেন, ‘যারা চায়নিজ নিম্নমানের যন্ত্রপাতি সরবরাহ করে শত শত কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছে তাদের সঙ্গে আমার প্রতিষ্ঠানও কালো তালিকাভুক্ত করেছে। এ নিয়ে আমার কোনো প্রশ্ন নেই। আমি এটুকু বলতে পারি, আমি সৎ। বাংলাদেশের এমন কোনো জায়গা নেই গত আট বছর ধরে আমার সরবরাহ করা মেশিন চলছে না, এমন কোথাও যদি দেখাতে পারেন আপনারা রিপোর্ট করেন। আমার ভুল হতে পারে, কিন্তু আমার জানা সত্ত্বে ব্যবসায়িক জীবনে কোনো দুই নম্বর পণ্য সরবরাহ করিনি। কেউ ২০০ কোটি টাকার পণ্য না দিয়ে বিল তুলে নিয়েছে, জার্মানির সরঞ্জামের কথা বলে চায়নিজ দিয়েছে, তার সঙ্গে আমাকে মেলানো হয়েছে। দুই নম্বর ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আমাকেও কালো তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। যেহেতু সরকার এটা করেছে তাই এ নিয়ে আমার কোনো প্রশ্ন নেই। এসব নিয়ে কথা বলতে আমি বিব্রতবোধ করি। এখানে নিশ্চয়ই আমার কোনো ভুল ছিল, তাই আমাকে কালো তালিকাভুক্ত করেছে। হেলথ সেক্টরে সবাই জানে বাংলাদেশে আমি সবচেয়ে ভালো সরঞ্জাম দিই। ’

সরকারি চাকরি ছেড়ে ঠিকাদারিতে আসার কারণ জানতে চাইলে আফতাব বলেন, ‘এটা আমার ব্যক্তিগত বিষয়। এটা নিয়ে আমি কথা বলতে চাই না। আমার হাজারটা পরিচয় থাকতে পারে। সবচেয়ে বড় পরিচয় হলো আমি ব্যবসায়ী। এর বাইরে আমার কোনো পরিচয় নেই। আমি শুধু এটুকু বলতে চাই, যারা নিম্নমানের ও দুই নম্বর পণ্য সরবরাহ করেছে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হোক। আমি ব্যবসা করি, লাভ করি, কিন্তু দুই নম্বরী করি না। ’

স্বাস্থ্য খাতের ঠিকাদার চক্রের দুর্নীতির বিষয়ে জানতে চাইলে দুদক চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ গণমাধ্যমে বলেন, ‘কমিশন ২০১৭ সালেই স্বাস্থ্য খাতের দুর্নীতি প্রতিরোধে প্রাতিষ্ঠানিক টিম গঠন করেছিল। ২০১৯ সালের শুরুতে স্বাস্থ্য খাতের দুর্নীতির ১১টি উৎস ও তা নিয়ন্ত্রণে ২৫ দফা সুপারিশ করে কমিশন। এগুলো বাস্তবায়ন করা গেলে স্বাস্থ্য খাতের দুর্নীতির লাগাম কিছুটা হলেও টেনে ধরা সম্ভব হতো। ’ তিনি আরও বলেন, ‘দুদক তদন্তের কোনো কিছু গোপন করে না, করবেও না। বিশ্বাসযোগ্য তথ্য ও দালিলিক প্রমাণাদির মাধ্যমে যেমন অপরাধীদের আমলে আনা হয়, তেমনি জনগণের কাছেও কমিশনকে জবাবদিহি করতে হয়। জনগণের এ প্রতিষ্ঠানটি জনগণের কাছে দায়বদ্ধ। আমরা সেই দায়বদ্ধতার জায়গা থেকে কাজ করছি। ’

Share This Post

আরও পড়ুন