সোমবার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০৯:১৭ পূর্বাহ্ন

রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ সংবাদপত্র : একটি পর্যালোচনা (ডক্টরঃ সৈয়দ রেজওয়ান আহমদ)

বিশেষ প্রতিবেদক মোহাম্মদ অলিদ সিদ্দিকী তালুকদার
  • প্রকাশ : রবিবার, ৫ জুলাই, ২০২০
  • ৩৫৪

রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ সংবাদপত্র : একটি পর্যালোচনা

(ডক্টরঃ সৈয়দ রেজওয়ান আহমদ)

সংবাদপত্র হল একটি লিখিত প্রকাশনা, যা বিশ্বকে জানার একটি সহজ পন্থা। সংবাদপত্রে থাকে বর্তমান ঘটনা, তথ্যপূর্ণ নিবন্ধ, সম্পাদকীয়, বিভিন্ন ফিচার এবং বিজ্ঞাপন। পৃথিবীর আধুনিক বিপ্লব ও সংগ্রামের ইতিহাসে সংবাদপত্রের ভূমিকা অনেক। দেশ-বিদেশের বিভিন্ন রকম সংবাদ মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে যুগ যুগ ধরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে সংবাদপত্র। যখন সংবাদপত্র ছিল না তখন বিশেষ দূতের মাধ্যমে খবর আদান প্রদান করা হতো।
আমরা জানি, সংবাদপত্রের শুরু খুব বেশি দিনের নয়। পঞ্চদশ শতকে মুদ্রণযন্ত্র উদ্ভাবনের পরে এর বিকাশ সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছে। প্রাক-আধুনিককালে রাজা-বাদশারা ‘ফরমান’ জারি করতেন, রাজভৃত্যরা তা যথাস্থানে পৌঁছে দিত, কিংবা ঢ্যাড়া পিটিয়ে জরুরি সংবাদ জানিয়ে দেওয়া হতো প্রজাদের। প্রজার খবরও রাজার কাছে পৌঁছে যেত গুপ্তচর মারফত। পৃথিবীর প্রাচীন সংবাদপত্র ধরা হয় ‘অ্যাক্টা ডানিয়া’কে। প্রাচীন রোমে জুলিয়াস সিজার ‘অ্যাক্টা ডানিয়া’ পত্রিকা বাজার, জনসাধারণের চলাচলের পথে সাঁটানোর নির্দেশ দেন। পাথরে বা ধাতুতে খোদাই করে সংবাদ পরিবেশন করা হতো সে পত্রিকায়। এরপর চীনের ‘হ্যান ডাইনেস্টিতে’ও পত্রিকার প্রচলন ছিল। ৭১৩ খ্রি. ট্যাং ডাইনেস্টি ‘কাইয়ুআন যা বাও’ শিরোনামে সরকারি খবর প্রকাশ করত। সিল্কের কাপড়ে হাতে লেখা সেই পত্রিকা শুধু সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য প্রকাশিত হতো। আধুনিক ইউরোপের শুরুর দিকে অস্ট্রিয়ার ভেনিস থেকে হাতে লেখা মাসিক খবরের পাতা বের হতো। তবে আধুনিক সংবাদপত্রের সবচেয়ে প্রাচীন পত্রিকাটি হচ্ছে জার্মান ভাষায় ১৬০৫ খ্রি. প্রকাশিত হয় ‘রিলেশন’ নামক প্রকাশনা। ১৬৯০খ্রি.‘বেঞ্জামিন হ্যারিস’র হাত ধরেই যুক্তরাষ্ট্রে প্রথম সংবাদপত্র প্রকাশিত হয়। ১৭২৫খ্রি. উইলিয়াম ব্রাডফোর্ড নিউইয়র্ক গেজেট নামে একটি পত্রিকা প্রকাশ করেন, এ পত্রিকা যুক্তরাষ্ট্রে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করে। ১৮৩৩ খ্রি. যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক থেকে ডেইলি নিউইয়র্ক সান প্রকাশিত হয়। ১৮৪১ খ্রি. দ্য নিউইয়র্ক ট্রিবিউন নামে এটি বের হয়। তাছাড়া মুঘল আমলে মুসলিম শাসনেও ভারতবর্ষে সংবাদপত্রের প্রচলন ছিল। অবশ্য তখন সংবাদপত্র মুদ্রিত হতো না। রাজনৈতিক সংবাদ হাতে লেখা হতো এবং তা দেশের গুরুত্বপূর্ণ রাজকর্মচারীর কাছে পাঠানো হতো। তবে এই উপমহাদেশে প্রথম আনুষ্ঠানিকভাবে ১৭৮০ খ্রি. প্রকাশিত সত্যিকারের পত্রিকা ‘বেঙ্গল গেজেট’। ১৮১৮খ্রি. বাংলা সংবাদপত্রের অভ্যুদয় ঘটে। ‘দিকদর্শন’ নামের আদি বাংলা সাময়িক পত্রিকা। দিকদর্শন প্রকাশের একমাস পর ১৮১৮খ্রি.’র ২৩মে সাপ্তাহিক ‘সমাচার দর্পণ’ পত্রিকাটির আত্মপ্রকাশ ঘটে। সমাচার দর্পণ বাংলা সাংবাদিকতার গোড়াপত্তনে অগ্রণী ভূমিকা রাখে। সমাচার দর্পণ প্রকাশের পক্ষকালের ব্যবধানেই প্রথম বাঙালি সম্পাদিত পত্রিকা সাপ্তাহিক ‘বাঙ্গালা গেজেট’ প্রকাশিত হয়। পত্রপত্রিকার ইতিবৃত্ত থেকে জানা যায়, এই উপমহাদেশের ভাষাগুলোর মধ্যে বাংলা ভাষাতেই সংবাদপত্রের প্রথম আত্মপ্রকাশ ঘটে। যার কারণে বলা হত, উপমহাদেশীয় সাংবাদিকতায় বাঙালিরাই পথিকৃত।আমরা জানি, ‘সংবাদপত্র’ বিশ্বে জনমত গঠনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ মাধ্যম। মানুষের আশা-আকাংখাকে তুলে ধরা। মানবিক চেতনা জাগ্রত করা। বাংলাদেশের আজকের ভৌগোলিক সীমানার মধ্যে প্রথম সংবাদপত্রটি প্রকাশিত হয়েছিল রংপুর থেকে, ‘রঙ্গপুর বার্তাবহ’। সেটা ১৮৪৭ খ্রি.’র আগস্ট মাসে। ব্রিটিশ শাসন থেকে ভারতবর্ষের স্বাধীনতার ঠিক একশ বছর আগে। কালের যাত্রায় দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে আজ আমাদের সংবাদপত্র বৈশ্বিক মানে পৌঁছে গেছে। এখন বাংলাদেশে অসংখ্য পত্রিকা প্রকাশিত হচ্ছে। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশে মিডিয়াভুক্ত সব ধরনের পত্রিকার সংখ্যা প্রায় ৩,০০০ কাছাকাছি। তন্মধ্যে দৈনিক পত্রিকা প্রায় ৬০০টি। আর বিশ্বব্যাপী দৈনিক খবরের কাগজের সংখ্যা এখন প্রায় সাত হাজার।
অনেকে মনে করেন বেতার, টেলিভিশন ও অনলাইন মিডিয়ার কারণে এখন প্রিন্ট মিডিয়ার গুরুত্ব ও প্রাধান্য কমে যাচ্ছে। তবে এটা কেউ কেউ মানতে রাজি নন। কারণ, সংবাদের গ্রহণযোগ্যতা ও নেপথ্য কারণ এবং সংবাদের পেছনের সংবাদ খুঁজতে সংবাদপত্রের বিকল্প নেই। অবশ্য বিপুল খরচ, অধিক লোকবল, বেতন-ভাতার চাপ, বিজ্ঞাপন নির্ভরতা, অতিরিক্ত সময় ব্যয় এবং অনলাইন ও ইলেকট্রনিকস মিডিয়ার প্রসারসহ নানা কারণে উন্নত বিশ্বে এখন প্রিন্টিং বা ছাপানো পত্রিকা প্রকাশনা হ্রাস পাচ্ছে। তবে যোগাযোগ প্রযুক্তির উন্নতির ফলে সাংবাদিকতার সামনে কিছু নতুন চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি হয়েছে। সাংবাদিকের রিপোর্ট তৈরির যে ফাইভ ডব্লিউ ওয়ান এইচ ফর্মুলা, সেই ফর্মুলা এখন চলছে না। কারণ, এই ডিজিটাল যুগে কখন কোথায় কী ঘটছে, তা খুব তাড়াতাড়ি ইন্টারনেট ও বেতার-টিভির সৌজন্যে দ্রুত সবাই জেনে যাচ্ছেন। সকালবেলায় পত্রিকা পাঠকের কাছে সেটা পুরনো বা বাসি খবর। তাই এ বিষয়টি সাংবাদিকতার জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ। এখন সাংবাদিকতাকে হতে হবে বিশ্লেষণী ও ব্যাখ্যামূলক; প্রতিটি খবরই হতে হবে অনুসন্ধানমূলক।
যখন সংবাদপত্রের বিশাল সাম্রাজ্য যখন গড়ে উঠেছে, তখন ইলেকট্রনিক মিডিয়া নতুন করে তার জায়গা নিতে শুরু করেছে। বাংলাদেশসহ তৃতীয় বিশ্বের দেশে যেখানে শিক্ষার হার বৃদ্ধি পাওয়ার সঙ্গে পত্রিকার প্রচারসংখ্যা বাড়ছে, সেখানে উন্নত বিশ্বে পত্রিকার প্রচারসংখ্যা কমে আসার পাশাপাশি বাড়ছে ইলেকট্রনিক মিডিয়ার প্রতি ঝোঁক। টিভি বা রেডিও নিউজ বুলেটিন তো রয়েছেই, অনলাইন নিউজ পেপার মূলত সংবাদপত্রের বিকল্প হয়ে উঠেছে। সময়ের সাথে সাথে এগিয়ে চলছে বাংলাদেশ। প্রযুক্তির আলো ছড়িয়ে পড়ছে সর্বত্র। দেশজুড়ে বিস্তৃতি লাভ করেছে দ্রুতগতির ইন্টারনেট। আজকের সংবাদ জানতে আগামীকালের সংবাদপত্রের জন্য অপেক্ষা করার সময় নেই। যখনই ঘটনা তখনই সংবাদ। গণমাধ্যমের সঙ্গে নতুন যে বিষয়টি এখন যুক্ত হয়েছে তা হলো অনলাইন গণমাধ্যম। দ্রুত অগ্রসরমান বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশেও জনপ্রিয় হয়ে উঠছে অনলাইন নিউজ পোর্টাল। সময়ের ধারাবাহিকতায় আমাদের অত্যন্ত প্রিয়মূখ সমাজের গর্বিত সন্তানদের সমন্বয়ে আধ্যাত্মিক শহর সিলেট থেকে breakings24 দৈনিক অনলাইন গণমাধ্যমের আত্মপ্রকাশে আমরা খুবই আনন্দিত। নতুন সংযোজিত অনলাইন নিউজ পোর্টাল সৎ, সত্যনিষ্ঠ, পক্ষপাতমুক্ত সংবাদ প্রচার এবং বস্তুনিষ্ঠ ভূমিকা বজায় রাখতে সচেষ্ট ভূমিকা রাখবে বলে আমাদের বিশ্বাস।
আমরা এখন আর কোনো সংবাদের জন্য রাত পোহানো পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয় না। মুহূর্তের মধ্যে হাতের মুঠোয় পাওয়া যায় সব খবর। ইন্টারনেট প্রযুক্তির মাধ্যমে এখন কম্পিউটারে অনলাইন পত্রিকা চালু হয়েছে। মাত্র কয়েক বছর যাবত এসব অনলাইন পত্রিকা পাঠকদের চাহিদা পূরণ করে আসছে। অনলাইন পত্রিকার মাধ্যমে মানুষ এখন মুহূর্তেই সারাবিশ্বের তাৎক্ষণিক ঘটে যাওয়া সংবাদগুলো পেয়ে যায়। এক কথায় বলা যায় অনলাইন গণমাধ্যমে বিশ্বকে জয় করতে পারবো আমরা সহজেই।

লেখকঃ অধ্যক্ষ- সৈয়দপুর শামসিয়া ফাজিল ( ডিগ্রি) মাদ্রাসা -| লেখক ও গবেষক -|
জগন্নাথপুর উপজেলা সুনামগঞ্জ

Share This Post

আরও পড়ুন