সোমবার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১০:২৪ পূর্বাহ্ন

কুষ্টিয়ায় করোনা পরিস্থিতি ভয়াবহ একদিনে সবোর্চ্চ ১৯ জনের মৃত্যু

কুষ্টিয়া প্রতিনিধি
  • প্রকাশ : রবিবার, ৪ জুলাই, ২০২১
  • ৪২

কুষ্টিয়ায় করোনা পরিস্থিতি ভয়াবহ।গত ২৪ ঘণ্টায় কুষ্টিয়ার করোনা ডেডিকেটেড ২৫০ শয্যার জেনারেল হাসপাতালে ১৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। তাঁদের মধ্যে করোনায় ১৩ জন ও উপসর্গে ছয়জনের মৃত্যু হয়।

রবিবার ৪ জুন সকালে সিভিল সার্জন কার্যালয় ও করোনা ডেডিকেটেড হাসপাতাল সূত্রে এ তথ্য জানা, করোনার প্রথম ও দ্বিতীয় ঢেউ এ একদিনে জেলা এটাই সবোর্চ্চ ১৯ জনের মৃত্যুর রেকর্ড ।

এদিকে কুষ্টিয়ায় কঠোর লকডাউন চতুর্থ দিনেও থেমে নেই সংক্রামক ও মৃত্যু।রবিবার ১৩ জনের মৃত্যুসহ জেলায় মোট মৃত্যুর সংখ্যা বর্তমানে ২৪৩ জন।

গত ২৪ ঘণ্টায় জেলায় ৬০৯টি নমুনা পরীক্ষায় নতুন করে ১৯৩ জনের করোনা শনাক্ত হয়েছে। শনাক্তের হার ৩১দশমিক ৬৮ শতাংশ। আজ পর্যন্ত জেলায় করোনার সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে ৮ হাজার ৪৭৫ জনের। তাঁদের মধ্যে সুস্থ হয়েছেন ৫ হাজার ৬৮৯ জন। গত ২৪ ঘণ্টায় সুস্থ হয়েছেন ৬৩ জন।নতুন আক্রান্ত ব্যক্তিদের মধ্যে কুষ্টিয়া দৌলতপুরে উপজেলায় সর্বোচ্চ ৪৫ জন,সদর উপজেলায় ৩৬ জন, কুমারখালীতে ৩১ ,ভেড়ামারায় ২৭,মিরপুরে ২৩ ও খোকসায় ৩১জন সনাক্ত হয়। যা এ যাবৎ খোকসায় ১ দিনে সর্বোচ্চ সনাক্ত আছেন। পিসিআর ল্যাব ও সি এস অফিস তথ্য মতে, বর্তমানে কুষ্টিয়ায় করোনা রোগী সংখ্যা ২ হাজার ৪৯৩ জন। তাঁদের মধ্যে হাসপাতালে আইসোলেশনে ২৬৫ জন ।হোম আইসোলেশনে আছেন ২ হাজার ২২৮ জন।অদ্যাবিধি জেলায় মোট আক্রান্ত হয়েছে ৮ হাজার ৪৭৫ জন।সুস্থ রুগীর সংখ্যা ৫ হাজার ৬৮৯ জন।কোভিড পরিক্ষা হয়েছে এমন ব্যক্তির ল্যাম্পলের রিপোর্ট অপেক্ষমাণ রয়েছে ২ হাজার ৫৫৩ জনের ।

পিসিআর ল্যাব ও সি এস অফিস তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে জুলাই মাসের ১ থেকে ৩ তারিখ পর্যন্ত কুষ্টিয়া জেলায় নতুন করে করোনা ভাইরাস কোভিড-১৯ সনাক্ত হয়েছে ৪ শত ২৫ জন। গত জুন মাসের ৩০ দিনে মারা গেছেন ৯৯ জন।আক্রান্ত হয়েছে ৩ হাজার ৫০ জন।কঠোর লকডাউনের ১৪ তম দিনেও কুষ্টিয়া করোনা পরিস্থিতি ভয়াবহ দিকে যাচ্ছে। তার মধ্যে গত ১৫ দিন কুষ্টিয়া করোনা পরিস্থিতি খুর বেশী ভয়াবহ রুপ ধারন করেছে।প্রতিদিন গড়ে অন্তত সনাক্ত হয়েছে ২০০ জন।হাসপাতের প্রতিদিন গড়ে ৬ থেকে ৭ জন করে মারা গেছেন।

হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক আবদুল মোমেন একাত্তর ট্রিবিউনকে বলেন, গত ২৪ ঘণ্টায় হাসপাতালে রেকর্ডসংখ্যক রোগী ভর্তি হয়েছেন। সব মিলিয়ে ২৫০ শয্যার করোনা ডেডিকেটেড এই হাসপাতালে আজ সকাল পর্যন্ত চিকিৎসাধীন আছেন ৩৪১ জন। তাঁদের মধ্যে করোনায় আক্রান্ত ২৭৩জন। বাকি ৬৮ জন ব্যক্তি উপসর্গ আছে।মোট ভর্তি রুগীর অর্থেক রুগীর অক্সিজেন সাপোর্ট লাগছে। তবে ক্রমশ বেশী আক্রান্ত রুগী হাসাপাতালে ভর্তি হচ্ছে।পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি।

নাম না প্রকাশ শর্তে একটি সুত্র একাত্তর ট্রিবিউনকে নিশ্চিত করেন, সব মিলিয়ে ২৫০ শয্যার করোনা ডেডিকেটেড এই হাসপাতালে আজ সকাল পর্যন্ত চিকিৎসাধীন ৩০- ৩৫ জনের অক্সিজেন লেভেল ৫০ এর নিচে।তাছাড়া ২৫০ শয্যার করোনা ডেডিকেটেড এই হাসপাতালে যে কয়টি অক্সিজেন flowmeter আছে তার মধ্যে অনেকগুলোর বিভিন্ন সমস্যা রয়েছে।তথ্যটি আরো বলে ৯০টি নতুন অক্সিজেন flowmeter কিনার কথা আছে।

২৫০ শয্যার করোনা ডেডিকেটেড হাসপাতালে করোনায় আক্রান্ত হয়ে ভর্তি থাকা পেয়িং ৫ নং কক্ষের ২৬ নং বেড।মাজেদা খাতুনের বড় ছেলে আজিজুর রহমান রবিবার সকাল সাড়ে আটটার সময় একাত্তর ট্রিবিউনকে জানান, আমার মা কোন চিকিৎসা পাচ্ছে না। মাকে ৩ জুলাই বেলা ১১ টায় ভর্তি করা হয়। এখন পর্যনত ডাক্তার আসেনি তাকে দেখতে। মা ডায়াবেটিকের রোগী। গতরাতে সে ঘুমায়নি।

এ দিকে জেলা ছাত্রলীগের ৬৫ জন স্বেচ্ছাসেবক সদস্য পালা ক্রমে ৪১৫ দিনের বেশী সময় ধরে কাজ করছে। তাঁরা রোগীর স্বজনদের ওয়ার্ডে প্রবেশে নিয়ন্ত্রণ করছেন। আরও কয়েকজন কর্মী রোগীদের অক্সিজেন লাগানোয় সহযোগিতা করছেন। কেউ আবার ওষুধ কিনে দিচ্ছেন। এ সময় আজিজুর রহমান নামের এক জন স্কুল শিক্ষক হাঁপাতে হাঁপাতে দৌড়ে এসে স্বেচ্ছাসেবকদের জানালেন, তাঁর মা মাজেদা খাতুনের অবস্থা ভালো না। শ্বাসকষ্ট বেড়ে গেছে। অক্সিজেনও শেষ হয়ে গেছে। দ্রুত সিলিন্ডার লাগবে। জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক শেখ হাফিজ এক কর্মীকে নিয়ে দ্রুত একটি বড় সিলিন্ডার নিয়ে ছুটলেন আজিজুর এর ওয়ার্ডে।

এভাবে প্রতি-নিয়ত স্বেচ্ছাসেবকের কর্মীরা ও ওয়ার্ডবয়েরা ছোট–বড় সিলিন্ডার নিয়ে ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে ছুটছেন।হাসপাতালের করোনা ওয়ার্ডগুলোর শয্যাসংকটে রোগীদের ঠাঁই হয়েছে মেঝেতে। সেখানেও পা ফেলার জায়গা নেই, রোগীতে ঠাসা। প্রায় প্রতিটি রোগীর মাথার কিনারে রাখা অক্সিজেন সিলিন্ডার। রোগীর স্বজনেরা পাশে বসে সিলিন্ডার পাহারা দিচ্ছেন। যাতে কেউ নিয়ে যেতে না পারেন। প্রতিটি ওয়ার্ডের মেঝে ও বারান্দায় রোগীরা শুয়ে আছেন। রবিবার সকালে মুষলধারে বৃষ্টি হয়েছে। তাতে বারান্দার রোগীদের পানির ছিটা পড়েছে। বারান্দায় পানি পড়ে ধুলো ভিজে কাদা হয়ে গেছে। ওয়ার্ডবয় ও স্বেচ্ছাসেবকের কাজ করা কর্মীরা ছোট–বড় সিলিন্ডার নিয়ে ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে ছুটছেন।

বিকাল সাড়ে পাঁচটার সময় ফোন কলের মাধ্যমে আজিজুর রহমান একাত্তর ট্রিবিউনকে জানান তাঁর মা এখন ভালো আছেন।

কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (আরএমও) তাপস কুমার সরকার বলেন, প্রতিদিন অন্তত ৫০০ অক্সিজেন সিলিন্ডার প্রয়োজন হচ্ছে। সেখানে আছে ৫৪৭টি সিলিন্ডার। রিফিল করতে দেওয়া হলে তখন একটু সমস্যায় পড়তে হয়। এ ছাড়া ছয় হাজার লিটারের সেন্ট্রাল অক্সিজেন রয়েছে। সেটা দিয়ে ১০ জনকে ২৪ ঘণ্টা অক্সিজেন সাপোর্ট দেওয়া হয়। রোগী বেড়ে যাওয়ায় মাঝেমধ্যে বিড়ম্বনায় পড়তে হয়। তিনি আরও জানান, জুনের তুলনায় চলতি জুলাই মাসে রোগীদের চাপ আরও বাড়তে পারে। কুষ্টিয়ার যে পরিস্থিতি, তাতে বোঝা যাচ্ছে করোনার পিক আওয়ার এখনো আসেনি।তিনি আরো বলেন এক সপ্তাহে এ হাসপাতালে প্রতি ২৪ ঘণ্টায় অন্তত ৫০ জন করে রোগী ভর্তি হচ্ছেন। হাসপাতাল রোগীতে ঠাসা।মারা যাওয়া বেশী ভাগ রুগী ৭ দিন থেকে ১০ দিন করোনা উপসর্গ নিয়ে বাড়িতে থাকার পরে শেষে অবস্থা যখন বেশী খারাপ হচ্ছে নিরুপায় হয়ে তখন হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে। ভর্তি হওয়া রুগীর মধ্য বেশী ভাগ রুগী গ্রাম থেকে আসছে।

৩ জুলাই ডিসি অফিস তথ্য মতে, ৯টি মোবাইল কোট পরিচালিত হয় এবং ৬৩ হাজার ৪ শত টাকা আদায় করা হয়।

উল্লেখ্য, এর আগে কুষ্টিয়ায় গত ৩ জুন কুষ্টিয়ার সিভিল সার্জন ডাঃ এইচ এম আনোয়ারুল ইসলাম কুষ্টিয়া জেলাকে কঠোর লোকডাউন দেওয়ার জন্য জেলার কর্তাদের উদার্থ আহবান জানিয়েছিলেন।সেই সময় জেলার কর্তারা রাজি হননি।করোনা পরিস্তিতি আরো খারাপ হলে ৮ দিন পর ১১ জুন কুষ্টিয়া পৌর এলাকায় ৭ দিনের জন্য কঠোর বিধি নিষেধ জারি করেন জেলা প্রশাসন।সাত দিনের কঠোর বিধি নিষেধ ঢিমেতালে চলে। করোনা সংক্রমণ আরো বেশী বৃদ্ধি পেলে সংক্রমণ প্রতিরোধে ২০ জুন জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ সাইদুল ইসলাম কুষ্টিয়া জেলায় সাত দিনের লকডাউন ঘোষণা করেন। সে সময় লকডাউনের ৬ দিনে জেলায় ৭৬৩ জনের করোনা শনাক্ত হয়েছে। মারা যান ৩২ জন। পরে পহেলা জুলাই পর্যন্ত লকডাউন বাড়ানো হয়। চিকিৎসা–সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, সঠিক সময়ে লকডাউন না দেওয়া ও বাস্তবায়ন না করায় এমন হতে পারে।

গত ২৪ ঘন্টায় খুলনা বিভাগে সর্বোচ্চ মৃত্যু হয় ৩৯ জনে।

Share This Post

আরও পড়ুন