সোমবার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১০:১৫ পূর্বাহ্ন

করোনার মধ্যেই বন্যার হানা কবে যাবে দুর্ভাবনা

মোহাম্মদ অলিদ সিদ্দিকী তালুকদার
  • প্রকাশ : শুক্রবার, ৭ আগস্ট, ২০২০
  • ২৬৩

বাংলাদেশ এখন এক চরম সংকটে। একদিকে করোনার থাবা অন্যদিকে বন্যা। গতবছর ডেঙ্গুর কারণে বহু মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। কিন্তু এ বছর বাড়তি যো হয়েছে মরণঘাতি করোনা। যদিও করোনা এক বৈশ্বিক মহামারি। বাংলাদেশের মানুষও রক্ষা পায়নি এই মহামারি থেকে। করোনার কারণে আজ বহু মানুষ কর্মহীনতায় ভুগছে। নিম্নআয়ের মানুষ না খেয়ে দিন অতিবাহিত করছে। শিক্ষিত বেকারদের কথা নাই বা বললাম। তারা না পারছে কোনো চাকরির পরীক্ষা দিতে না পারছে গ্রামে দীর্ঘদিন অবস্থান করে কৃষি কাজ করতে।

অপরদিকে কৃষকরা যে উঠে দাঁড়াবে সেটাও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে বন্যার কারণে। দেশের বেশিরভাগ ফসল উৎপাদন হয় উত্তরবঙ্গে আর সেখানে প্রতিবছরই বন্যার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ আঘাত হেনে চলেছে। এ বছরও এই শত্রু আঘাত হানতে ভুলিনি। বন্যাদুর্গত বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ক্ষতিগ্রস্তরা বলেছেন, মহামারি করোনাভাইরাসের প্রকোপের মাঝে বন্যায় তারা চরম অসহায় পরিস্থিতিতে পড়েছেন। শুধু উত্তরবঙ্গ নয় রাজধানীর ঢাকার নিচু এলাকাগুলোর দিকে বন্যা ধেয়ে আসছে এবং মধ্যাঞ্চলের জেলাগুলোতে ব্যাপক অবনতি হচ্ছে। পদ্মায় ভাঙন ধরেছে এখনো থামছে না।

উত্তরের জেলা কুড়িগ্রামের কাজিয়ার চর এলাকায় এমনও পরিবার আছে যারা কিনা একমাসের বেশি সময় ধরে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে নৌকায় বাস করছেন। অনেকে চোখের সামনে তাদের ঘরবাড়ি সর্বস্ব বিলীন হতে দেখেছেন এই নদী ভাঙনের কারণে। এই অসহায় মানুষেরা পড়েছে চরম বিপাকে। করোনার জন্য লকডাউন গেলো এখন আবার বন্যা। মানুষের কোনো কাজ নেই। সরকারি ত্রাণ দিয়ে আর কতদিন সংসার চালানো যায়।

তাছাড়া বন্যার কারণে সাপের উপদ্রব বেড়ে গিয়েছে সেই সাথে ডায়রিয়ার মতো রোগ ব্যাধি তো আছেই। বন্যা কবলিত এলাকাগুলোতে একটা বড় জনগোষ্ঠী কর্মহীন হয়ে রয়েছেন এবং তারা পর্যাপ্ত ত্রাণ সহায়তা না পাওয়ার অভিযোগ করছেন। তবে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. মহসিন বলেছেন, করোনাভাইরাস মহামারির মধ্যে বন্যা পরিস্থিতি সামাল দেয়ার চ্যালেঞ্জ বিবেচনা করেই তারা ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তা দিচ্ছেন।

অন্যান্য বছরের বন্যার সাথে এবারের বন্যার পার্থক্যটা হচ্ছে, করোনাভাইরাস এবং তার মধ্যেই বন্যার হানা।তবে এ বছর সবকিছু বিবেচনা করে আশ্রয়কেন্দ্রের সংখ্যা বাড়ানো হয়েছে। এবার এ পর্যন্ত ১৬০৩ টি আশ্রয়কেন্দ্র করা হয়েছে। যা আগের বছরের তুলনায় অনেক বেশি। কারণ এবার করোনাভাইরাসের কথাও মাথায় রাখতে হয়েছে, যাতে সামাজিক দূরত্ব রক্ষা করা যায়। কিন্তু রাজনৈতিক দল এবং এনজিওগুলোর মাঠে এখনও তেমন ত্রাণ তৎপরতা নেই বলে বিভিন্ন এলাকা থেকে ক্ষতিগ্রস্তরা জানিয়েছেন।

১৯৯৮ সালে বন্যা দুই মাসের বেশি সময় স্থায়ী ছিল। এবার এক মাসের বেশি সময় ধরে বন্যা চলছে। এই বন্যা স্থায়িত্বের দিক থেকে ৯৮ এর পর দ্বিতীয়। বন্যায় প্লাবিত বিভিন্ন এলাকায় কমেনি বন্যার পানি। মাদারীপুরে বন্যার কড়াল গ্রাসে ভেঙে যাচ্ছে বিভিন্ন স্থাপনা। টাঙ্গাইল, সিরাজগঞ্জের অবস্থা দিনে দিনে খারাপ হচ্ছে। ভারত ও নেপালের পানির কারণে মূলত আমাদের বন্যার প্রকোপটা বেশি। মুন্সিগঞ্জে বন্যার পানি কিছুটা কমে যাওয়ার কারণে রাস্তাঘাটের ভাঙন চোখে দেখা যাচ্ছে।

সরকারি হিসাবে ৩১টি এই বন্যায় এ পর্যন্ত ৪১ জনের মৃত্যু হয়েছে। বাংলাদেশে এবারের বন্যায় এখন পর্যন্ত প্রায় অর্ধকোটি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন বলে সরকারি হিসাবেই বলা হচ্ছে। শুধু উত্তরবঙ্গেই নয় বন্যা সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানিয়েছে, এখন রাজধানীর ঢাকায় নিচু এলাকাগুলোর দিকে বন্যা ধেয়ে আসছে এবং মধ্যাঞ্চলের জেলাগুলোতে অবনতি হচ্ছে। ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে দিনেদিনে। তাছাড়া বন্যা কবলিত এলাকার মানুষ গবাদিপশু নিয়েও বিপদে রয়েছেন।

এবার তিন দফায় আঘাত হেনেছে বন্যা। বাংলাদেশে ৩১টি জেলায় করোনাভাইরাস এবং বন্যা-এই দু’টি দুর্যোগ একসাথে মোকাবিলা করাটা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিভিন্ন কারণে বাংলাদেশে বন্যা সংঘটিত হয় ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বন্যা দেখা দেয়। এদেশে পদ্মা, মেঘনা, যমুনা- এ প্রধান তিনটি নদীর মিলনস্থলে অবস্থিত পৃথিবীর বৃহত্তম বদ্বীপ বাংলাদেশ। যা সমুদ্র পৃষ্ঠ থেকে মাত্র ৬-৭ মিটার উঁচু। ফলে বর্ষাকালে যখন তিনটি নদীর বিশাল অববাহিকায় পানি একসঙ্গে এসে পড়ে তখন বাংলাদেশে পানির প্রবাহ বৃদ্ধি পায়। ফলে তা থেকে বন্যার সৃষ্টি হয়।

ভারত প্রতিবছর শুকনো মৌসুমে ফারাক্কার পানি আটকে রাখে এবং বর্ষা মৌসুমে সকল গেট খুলে দিয়ে বাংলাদেশেকে ডুবিয়ে দেয়ার প্রয়াস চালায়। যার ফলে বাংলাদেশের বন্যার আকার ভয়াবহ রূপ ধারণ করে। বন্যার প্রতিকার করতে পর্যাপ্ত পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করতে হবে আমাদের। বর্তমানে যেসব বেড়িবাঁধ আছে সেগুলো আরো উঁচু করতে হবে। নদীর পাড়সহ সারাদেশে প্রচুর গাছ লাগাতে হবে। তাছাড়া বন্যাদুর্গতদের জন্য আশ্রয় কেন্দ্র নির্মাণ করতে হবে যাতে তারা দুর্যোগের সময় এখানে আশ্রয় নিতে পারে। বন্যার স্থায়ী সমাধানের উপর নির্ভর করছে এ দেশের মানুষের স্বস্তি ও শান্তি।

পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্র ভারতের অসহনশীল মনোভাবকে রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা করে মরণ ফাঁদ ফারাক্কাকে রুখতে হবে। সে জন্য চাই জাতীয় উদ্যোগ ও সুষ্ঠু পরিকল্পনা। সরকারের পাশাপাশি জনগণেরও। করোনার মধ্যে বন্যা আমাদের উপর সত্যিই একটা ব্যাপক ক্ষতিকর প্রভাব ফেলেছে। অর্থনৈতিকভাবে আমরা বিপর্যস্ত হয়েছি। তবে ভেঙে পড়লে চলবে না আমাদের। কারণ রাত যত গভীর হয় সকাল তত সন্নিকটে আসে। এই মুহূর্তে আমাদের উচিৎ হবে, ভেঙে না পড়ে মনে সাহস রাখা ও ধৈর্য ধারণ করা এবং সবাই মিলে করোনা রোগী ও বানভাসি মানুষের পাশে দাঁড়ানো।

মহামারি করোনা ও বন্যার মাঝেই আমাদের যার যার অবস্থান থেকে আশার আলো খুঁজে নিতে হবে। করোনা বিপর্যয়ের মধ্যে বন্যার হানা, তবুও আমরা আশার আলোর স্বপ্ন দেখতে ভুলবোনা।

লেখক : বিশেষ প্রতিবেদক এইচ টিভি -| সাবেক কাউন্সিলরঃ বিএফইউজে-বাংলাদেশ -| সদস্য ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন (ডিইউজে -) ও মানবাধিকার সংগঠক -|

Share This Post

আরও পড়ুন