বৃহস্পতিবার, ০২ ডিসেম্বর ২০২১, ০৩:৪০ অপরাহ্ন

ইতিহাসের মানজিকার্ট

ফরহাদ আহমেদ
  • প্রকাশ : বৃহস্পতিবার, ২৬ আগস্ট, ২০২১
  • ৪৬

প্রতি বছর ২৬ আগস্ট, সমগ্র মুসলিম বিশ্ব বিশেষ করে তুর্কিরা ১০৭১ সালের মানজিকার্টের যুদ্ধে বাইজান্টাইন সম্রাট চতুর্থ রোমানোসের বিরুদ্ধে সুলতান আল্প আরসলানের নেতৃত্বে সেলজুক তুর্কিদের বিজয়কে স্মরণ করে থাকে।

ঐতিহাসিকভাবেই হিত্তিন ও আইনে জালুতের যুদ্ধের মতোই মানজিকার্টের যুদ্ধও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই যুদ্ধের সুদূরপ্রসারী ফলাফল এই অঞ্চলে কয়েক শতাব্দী ধরে অনুভূত হয়েছিল। মানজিকার্টের যুদ্ধের ঐতিহাসিক মুহূর্তের ফলাফলগুলি সঠিকভাবে মূল্যায়ন করার জন্য সুলতান আল্প আরসালানকে নিয়ে সংক্ষিপ্ত আলোচনার প্রয়োজন আছে।

১০৬৩ সালে সেলজুক রাজ্যের প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা তুঘরিল বে-এর মৃত্যুর পর সিংহাসনের উত্তরাধিকারী না থাকায় তার ভাতিজা মুহাম্মদ আলপ আরসলান কে তার মন্ত্রী নিজাম-উল-মুলকের সাহায্যে নির্বাচিত করা হয়। এই নিজাম-উল- তার বুদ্ধিমত্তা, প্রভাবশক্তি এবং সম্পদশক্তির জন্য ইতিহাসে বিশেষভাবে পরিচিত।

আল্প আরসালান, তার চাচা তুঘরিল বে-এর মতো একজন নির্ভীক এবং দক্ষ নেতা ছিলেন। তিনি তার রাজ্যে নতুন অঞ্চল অন্তর্ভুক্ত করার আগে সেলজুক-অধ্যুষিত অঞ্চলসমূহে তার শাসন সুসংহত করার জন্য বিশেষ নীতি গ্রহণ করেছিলেন। কোন নতুন অঞ্চল জয় করার আগে নিজের রাজ্যের ভিতরে তার শাসনের ভিত্তি এবং রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা করতেই তার প্রায় সাত বছর লেগেছিল।

অনেক তুর্কি ঐতিহাসিক মানজিকার্টের যুদ্ধকে আনাতোলিয়া বিজয়ের সূচনা এবং সেটিকে তুর্কিদের স্থায়ী জন্মভূমিতে রূপান্তর করার প্রধান পদক্ষেপ বলে মনে করেন কারণ যুদ্ধের পর হতেই অনেক তুর্কি গোষ্ঠী পূর্ব আনাতোলিয়ার বেশ কয়েকটি এলাকায় বসতি স্থাপন শুরু করতে থাকে। সুতরাং, এটি যে আনাতোলিয়ায় তুর্কি আমিরাতের প্রথম আমলের সূচনা ছিল তা আমরা বলতেই পারি।

এর মধ্যে সুলতান আল্প আরসলান মিশরকে ফাতেমীদের হাত থেকে মুক্ত করার জন্য একটি বিশাল সেনাবাহিনী প্রস্তুত করেছিলেন। পথে তিনি দিয়ারবাকর শহর অবরোধ করে এবং এর নিয়ন্ত্রণ নেন, তারপর আলরহাকে ঘেরাও করেন কিন্তু বাইজেন্টাইনদের শাসনের অধীনে থাকায় তিনি তা দখল করতে সক্ষম হন নি। এর পরে, আরসালান তার সেনাবাহিনীকে আলেপ্পোতে নিয়ে যান এবং ফাতেমীপন্থী মার্দাসিয়ানদের কাছ থেকে এর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেন। এই সময় তিনি জানতে পারেন যে রোমান সম্রাট রোমানাস ডায়োজেনিস বিশাল সেনাবাহিনী নিয়ে সেলজুক রাজ্য ধ্বংস ও পূর্ব আনাতোলিয়া, ইরানে এবং তারপর বাগদাদ হতে তুর্কিদের উপস্থিতির অবসান ঘটাতে এগিয়ে আসছেন।

আল্প আরসলান তৎক্ষণাত ইউফ্রেটিসের (ফোরাত নদি) পূর্ব দিকে চলে যান। তার এই চলার পথে বিভিন্ন কারণে তিনি অনেক সৈন্য এবং সরঞ্জাম হারিয়েছিলেন তিনি তার স্ত্রী এবং তার মন্ত্রী নিজাম-উল-মুলককে হামেদানে পাঠিয়েছিলেন এবং তিনি রাজধানীতে ফিরে আসার কথা না ভেবে সৈন্যদের জড়ো করে নতুনভাবে সংগ্রামের ডাক দিয়েছিলেন। আলপ আরসালান মনে করলেন যে শক্তিবৃদ্ধির জন্য রাজধানী থেকে সৈন্যদের অপেক্ষা করা তার পক্ষে সম্ভব হবে না কেননা তার সৈন্যদের সাথে বাইজেন্টাইনদের বিশাল সেনাবাহিনী মুখোমুখি হওয়ার জন্য মুখিয়ে আছে।

বাইজেন্টাইনরা পূর্ব এবং দক্ষিণ -পূর্ব আনাতোলিয়ায় আল্প আরসালানের নেতৃত্বে সেলজুকদের আন্দোলন এবং বিজয়ের কারণে ব্যাপকভাবে বিরক্ত হয়েছিল। শেষে সম্রাট চতুর্থ রোমানোস একটি বৃহৎ সেনাবাহিনী নিয়ে আসতে বদ্ধপরিকর হলেন যা দিয়ে তিনি সেলজুকদের ধ্বংস ও তার সাম্রাজ্যের সীমানা সুরক্ষিত করতে চেয়েছিলেন।

নতুন সম্রাটের নিজেকে সম্রাট হিসেবে প্রমাণ করতে এবং তার বৈধতা নিশ্চিত করার জন্য একটি মহান বিজয় বা সাফল্যের প্রয়োজন ছিল। তিনি একজন মহান নেতা এবং যোদ্ধা ছিলেন। একটি বিশিষ্ট পরিবারে জন্ম নিলেও তিনি কোন রাজবংশ থেকে আসেননি বরং সম্রাট কনস্টানটাইন এক্স দুকাসের বিধবা স্ত্রী এদুকিয়া মাকরামবোলটিসাকে বিয়ে করার পর সম্রাটের মুকুট পেয়েছিলেন।

বাইজেন্টাইন সেনাবাহিনীর সদস্য সংখ্যা নির্ধারণে ঐতিহাসিকদের মধ্যে মতভেদ আছে , তাদের মধ্যে কেউ কেউ বলেছিলেন যে সম্রাটের সেনাবাহিনীতে ২০০০০০ সৈন্য ছিল। অন্য কিছু ঐতিহাসিক বলছেন সৈন্যের সংখ্যা ছিল ৩০০০০০।

অন্যদিকে, বেশিরভাগ সূত্র বলছে যে সুলতান আল্প আরসালানের ১৫০০০ সৈন্য থাকার কথা শোনা যায়। যার মধ্যে ৪০০০ ছিল সুলতানের ‘বিশেষ সৈন্য’।

সুলতান তার সৈন্যদের সাথে নিয়ে এমন সময় আসেন যখন বাইজেন্টাইন সম্রাট আখাল্লাত ও মানজিকার্টের মাঝখানে আল-রাহওয়া নামে পরিচিত একটি স্থানে শিবির স্থাপন করে ফেলেছেন। আল্প আরসালান সম্রাটকে যুদ্ধবিরতির প্রস্তাবও পাঠালেন। কিন্তু সম্রাট তা প্রত্যাখ্যান করে বললেন, “সেলজুকদের রাজধানী দখল করা ছাড়া কোন যুদ্ধবিরতি নেই এবং রোমানদের দেশে তারা যা করেছিল ইসলামের দেশে তাই করা হবে”

জুমার নামাজে যোগ দেওয়ার পর, আল্প আরসালান একটি সাদা পোষাক পরলেন। ঘোড়ার কাছে গিয়ে তার লেজ ধরে সৈন্যদের উদ্দেশ্যে ভাষণ দেয়া শুরু করলেন।
“যে আমাকে অনুসরণ করতে ভালোবাসে, সে আমাকে অনুসরণ কর এবং যারা চলে যেতে চায়, আমার আশীর্বাদ নিয়ে চলে যাও। আমরা সবাই ইসলামের সেবায় সমান। আমি এখানে আজকে সুলতান নই, যিনি সৈন্যদের আদেশ দিতে পারেন। আমি আজ শাহাদাত কামনা করি। যদি আমি যুদ্ধে মারা যাই, আমাকে একই স্থানে কবর দিবে এবং আমার পুত্র মালিক শাহের নেতৃত্বে জিহাদ চালিয়ে যাবে। ”

অতঃপর, দুই বাহিনী মিলিত হল এবং একটি ভয়াবহ যুদ্ধ শুরু হল যা সূর্যের অস্তিত্ব পর্যন্ত স্থায়ী ছিল। সুলতান আল্প আরসালান ছিলেন অত্যন্ত সাহসের সাথে যুদ্ধরত সৈন্যদলের সম্মুখভাগে। যুদ্ধের সময় সেলজুকরা তুরস্কের বিখ্যাত সব যুদ্ধ কৌশল চালায়। সৈন্যদের অন্যন্য দলকে যুদ্ধক্ষেত্রের কাছাকাছি অবস্থানে লুকানোর আদেশ দিয়ে সৈন্য প্রত্যাহারের ভান করে।

বাইজেন্টাইন সেনাবাহিনী ভাবল যে সেলজুকরা পিছু হটছে। এটা মনে করে তারা তাদের অনুসরণ করতে এগিয়ে যায় কিন্তু অনেক সরঞ্জাম এবং তাদের বর্মের ওজনের কারণে তারা তাদের ধরতে পারছিল না। কারণ তুর্কি অশ্বারোহীরা ছিল ওজনে হালকা এবং চটপটে।

কিছুক্ষণ পরে, সৈন্যদের লুকিয়ে থাকা দলগুলি বাইজেন্টাইন সেনাবাহিনীকে পেছন থেকে অর্ধচন্দ্রাকৃতির আকারে ঘিরে ফেলতে শুরু করে। সেলজুকরা বাইজেন্টাইনদের তীরের বৃষ্টি বর্ষণ করতে থাকে এবং হাজার হাজার শত্রুকে হত্যা করে।

সেলজুকরা রোমানাসের অধীনে থাকা বাইজেন্টাইন সেনাবাহিনীর চারপাশ ঘিরে ফেলে এবং বাকি সেনাবাহিনী থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়। এরপর অশ্বারোহী বাহিনী বাইজেন্টাইন সেনাবাহিনীর মুখোমুখি হতে ফিরে আসে। সেলজুকরা সম্রাট রোমানাসের সেনাবাহিনীকে একেবারে নির্মূল করতে শুরু করে।

সূর্যাস্তের আগে সেলজুকরা বাইজেন্টাইন সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে স্পষ্ট বিজয় (ফাতহুম মুবিন) অর্জন করে। শত্রুদের অধিকাংশকেই হত্যা করা হয়ে এবং বাকিরা পালিয়ে যায়। রোমানোসকে বন্দী করা হয়। ইতিহাসে প্রথমবারের মতো একজন বাইজেন্টাইন সম্রাট একজন মুসলিম সেনাপতির বন্দী হন।

সুলতান আল্প আরসালান যুদ্ধবিরতি প্রস্তাব গ্রহণ না করে মুসলমানদের সাথে লড়াই করার জন্য সম্রাটকে তিরস্কার করেন।

তিনি সম্রাটকে জিজ্ঞাসা করলেন, “আমাকে যদি বন্দী হিসেবে আপনার সামনে আনা হতো তাহলে আপনি কি করতেন? ” সম্রাট উত্তর দিলেন, “সম্ভবত আমি তোমাকে হত্যা করতাম অথবা কনস্টান্টিনোপলের রাস্তায় তোমাকে প্রদর্শন করতাম।”

আল্প আরসালান সম্রাটকে জিজ্ঞাসা করলেন আপনার ব্যাপারে চূড়ান্ত বিকল্প কী। সম্রাট বললেন “আমাকে ক্ষমা করুন এবং আমাকে আমার রাজ্যে ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য মুক্তিপণ গ্রহণ করুন,”

আল্প আরসালান যে শব্দগুলি উচ্চারণ করেছেন তা হল, “আমি আপনাকে ক্ষমা করলাম এবং আপনাকে মুক্ত করলাম।”

রোমানোস হতবাক হয়েছিলেন কারণ তিনি প্রতিদ্বন্দ্বীর কাছ থেকে এমন উদারতা আশা করেননি। আল্প আরসালান তার সাথে শান্তিপূর্ণ ও সম্মানজনক আচরণ করেছিলেন। ১.৫ মিলিয়ন স্বর্ণ দিনারের মুক্তিপণ পরে সম্মত হয়েছিল; যাইহোক, যখন রোমানোস তার রাজধানীতে ফিরে আসেন তখন তিনি ক্ষমতাচ্যুত হন।

তিনি সম্রাট হিসেবে তখন দেড় মিলিয়ন মুক্তিপণের প্রতিশ্রুতি দিলেও
মাত্র ৩০০০০০ দিনারের বেশি সংগ্রহ করতে পারেননি। তিনি আল্প আরসালানের কাছে পাঠিয়েছিলেন তা গ্রহণ করার জন্য বিনীত অনুরোধসহ। সুলতান আল্প আরসলান তার উদারতা দিয়ে বাকিটুকু ক্ষমা করে দেন।

যখন সম্রাট রোমানোস ইসলামের ভাল বোধ নিয়ে তার অঞ্চলে ফিরে আসেন, তখন তার দরবারের অমাত্যবর্গ তাকে ক্ষমতাচ্যুত করে। ২৯ জুন, ১০৭২ সালে তাকে নিষ্ঠুরভাবে অন্ধ করে দেয়া হয় এবং তাকে নির্বাসিত করা হয় যেখানে তিনি ক্ষতবিক্ষত অবস্থায় মারা যান।

বাইজেন্টাইন সেনাবাহিনীর উপর সেলজুকদের বিজয়ের খবর মুসলিম বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে এবং আব্বাসীয় খলিফা সুলতান আল্প আরসলানের কাছে একটি চিঠি পাঠিয়ে তাকে এই মহান বিজয়ের জন্য অভিনন্দন জানান এবং তিনি তাকে সর্বশ্রেষ্ঠ সুলতান বা ” সুলতান-ই-আজম” উপাধি দেন।

যুদ্ধের প্রায় ১১ মাস পর সুলতান আল্প আরসালান দুর্ঘটনার শিকার হন; তিনি ইউসুফ নামে এক শত্রু প্রধানকে গ্রেফতার করেন। যখন তাকে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার জন্য আনা হয়েছিল, তখন সে হঠাৎ আল্প আরসলানকে একটি ছুরি দিয়ে আক্রমণ করে। সুলতান মারাত্মকভাবে আহত হন এবং কয়েক ঘণ্টা পর ২৫ নভেম্বর ১০৭২ সালে ৪৪ বছর বয়সে মারা যান। তাকে তার বাবা দাউদ চাগরি বে -এর পাশে মার্ভে সমাহিত করা হয়। তার স্থলাভিষিক্ত হন তার ১৭ বছর বয়সী ছেলে মালিক শাহ।

মানজিকার্টের বিজয়কে তুর্কি উপজাতি এবং গোষ্ঠীর জন্য আনাতোলিয়ার দ্বার উন্মোচন হিসাবে বিবেচনা করা হয়। সুলতান আল্প আরসালান আনাতোলিয়ায় আক্রমণ এবং বিজয় ছিনিয়ে আনার জন্য যুদ্ধে তার সাথে থাকা সমস্ত কমান্ডার এবং উপজাতীয় প্রধানদের অনুমতি দিয়েছিলেন। যে কেউ জমি দখল করলে তাকে তার বংশের মালিকানা এবং বসবাসের অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। এইভাবে তুর্কিদের আনাতোলিয়ায় প্রথম অধ্যায়ের সূচনা হতে শুরু করে।

পরবর্তীতে এর কারণে সেলজুক আনাতোলিয়ান রাজ্য বা সেলজুক রুম প্রতিষ্ঠারও একটি প্রস্তাব উত্থাপন হয়। তারপর, অটোমান সাম্রাজ্য যেটিকে বলা হয় তুর্কি ইতিহাসের সবচেয়ে শক্তিশালী সাম্রাজ্য সেটি তাদের সেলজুক পূর্বপুরুষদের অনুসরণ করেছিল।

মানজিকার্টের বিজয় মুসলিম বিশ্বের বিরুদ্ধে ক্রুসেডের সূচনাও করে দিয়েছিল। সেলজুক রাজ্য শক্তিশালী হওয়ার পর এবং বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্য পরাজিত হওয়ার পর ইউরোপীয় পশ্চিমারা বুঝতে পেরেছিল যে মুসলিম হামলার বিরুদ্ধে ইউরোপের পূর্ব দরজা রক্ষা করার জন্য এখন আর বাইজেন্টাইন এবং রোমের উপর নির্ভর করা যায়না। তাই ইউরোপ নিজেই বিজয়ের কথা ভাবতে শুরু করে এবং এর ফলে ১০৯৫ সালে পোপ ২য় আরবান এর আমন্ত্রণে প্রথম ক্রুসেডের সূচনা হয়েছিল।

Share This Post

আরও পড়ুন