মঙ্গলবার, ২৫ জানুয়ারী ২০২২, ০৮:০৯ অপরাহ্ন

>>> আজকের সম্পাদকীয়<<< ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের অপব্যবহার _ নাগরিক হেনস্তা বন্ধ হোক

মোহাম্মদ অলিদ সিদ্দিকী তালুকদার
  • প্রকাশ : শনিবার, ৪ জুলাই, ২০২০
  • ২৭১

 

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের অপব্যবহার নিয়ে নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে আগে থেকেই সতর্ক করা হয়েছিল। এই আইনের মাধ্যমে অপরাধ না করেও অনেকে শায়েস্তা হয়ে যেতে পারেন কথাটি বলা হচ্ছিল। বিশেষ করে দুর্নীতির বিরুদ্ধে কথা বলার সীমিত সুযোগও বন্ধ হয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা এই আইনের সুযোগে হচ্ছে। এখন দেখা যাচ্ছে, সেই আশঙ্কা সত্য পরিণত হয়েছে। ২০১৮ সালের ৯ অক্টোবর আইনটি কার্যকর হওয়ার পর থেকে সাংবাদিকরা বেশি হয়রানির শিকার হচ্ছেন। অন্য দিকে ক্ষমতাসীনদের ব্যাপারে যারা কথা বলছেন, এ আইনের বলে তাদের হেনস্তা করা হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, সচেতন মানুষ এর শিকার হচ্ছেন। আইন প্রণয়নের লক্ষ্যই এখন প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে যাচ্ছে। এ ধারণাই সত্য বলে প্রমাণিত হচ্ছে, সরকার সচেতনভাবে এমন আইন প্রণয়ন করছে, যার অপব্যবহার করে নিজেদের অপকর্ম ঢাকতে চাইছে।
বিশ্বে চলছে এখন করোনা মহামারীর বিশেষ সঙ্কটকাল। এ সময়ে সরকারি স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থার দুর্বলতার কারণে মানুষ চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। তাই মানুষ ক্ষোভের কথা না জানিয়ে পারছে না। এসব ব্যাপারে সরকারের প্রয়োজনীয় সংশোধনমূলক ব্যবস্থা নেয়াই ছিল কাম্য। আমরা দেখছি, অনেক ক্ষেত্রে শায়েস্তা করার নীতি গ্রহণ করা হচ্ছে। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন একটা হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে। নয়া দিগন্তে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জানা যাচ্ছে, দেশে চলতি বছরের জানুয়ারিতে ১০টি, ফেব্রুয়ারিতে ৯টি, মার্চে ১৩টি, এপ্রিলে ২৪টি, মে মাসে ৩১টি ও জুনে ২২টি মামলা হয়েছে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে। সব মিলিয়ে চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে এ আইনে মামলার সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ বেড়ে ১০৯টি হয়েছে। ২০১৯ সালে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে ৬৩টি মামলা হয়।
একটি সংবাদমাধ্যম সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে করা ৪৩টি মামলার এজাহার বিশ্লেষণ করে দেখেছে, এর ১১টি হয়েছে করোনাভাইরাস নিয়ে ‘গুজব ছড়ানো’র অভিযোগে। ছয়টি মামলা হয়েছে মন্ত্রী, সংসদ সদস্য বা স্থানীয় মেয়রকে জড়িয়ে ‘মিথ্যা সংবাদ পরিবেশন’ বা ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেয়ার অভিযোগে। ত্রাণ চুরি নিয়ে ‘মিথ্যা তথ্য’ ছড়িয়ে দেয়া ও সংবাদ পরিবেশনের অভিযোগে পাঁচটি, চিকিৎসার সমালোচনা করে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেয়ায় একটি মামলা করা হয়। এসব মামলাও করোনাভাইরাস সংশ্লিষ্ট সরকারের সমালোচনা থেকে হতে পারে। প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে কটূক্তি করার অভিযোগে তিনটি, ধর্ম নিয়ে কটূক্তি করার অভিযোগে তিনটি, পুলিশের সমালোচনা করে সংবাদ পরিবেশন ও ফেসবুক স্ট্যাটাস দেয়ার অভিযোগে চারটি, বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী নিয়ে সমালোচনা করায় দু’টি, চাঁদা না পেয়ে সংবাদ পরিবেশনের অভিযোগে একটি এবং ব্যক্তিগত বিরোধের জেরে একটি মামলা হয়েছে। এসব মামলার ১৭টি করেছেন আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য, ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান, সদস্য, ছাত্রলীগ ও স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাবেক ও বর্তমান নেতা। ২৪টি মামলা করেছে পুলিশ। গ্রেফতার হয়েছেন অন্তত ৫২ জন, তাদের মধ্যে ১২ জন সাংবাদিক।
ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনটি অপরাধ দমনে কতটা ভূমিকা রাখছে আমাদের কাছে তা বোধগম্য নয়। গুজব, মিথ্যা সংবাদ, ধর্মের অবমাননা, ক্ষমতাসীন দলের নেতার কটূক্তি, রাষ্ট্রের ভাবমর্যাদা খর্ব করাÑ এ ধরনের বিমূর্ত অভিযোগের বিরুদ্ধে কঠোরভাবে ব্যবহার হচ্ছে। এসব অভিযোগ আইনের ব্যাখ্যায় মাত্রাগত হিসেবে কতটা অপরাধ আইনের বিশেষজ্ঞরা বলতে পারবেন। তবে এর দ্বারা সাধারণ জনসমাজ অপরাধের বিরুদ্ধে প্রতিকার পাচ্ছে ব্যাপকভাবে তা বলা যাবে না। অন্য দিকে, এসব মামলার মূল অভিযোগকারীরা প্রধানত ক্ষমতাসীন দলের কেউ, নয়তো পুলিশ। বাস্তবে অপরাধ বেশি সংঘটিত হয় সাধারণ মানুষের বিরুদ্ধে। নানা ধরনের অপরাধী চক্রের হাতে তারা নিগৃহীত হয়ে থাকেন। দেশের আইনের শাসনের দুর্বলতার কারণে সাধারণ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনটি আমাদের বিচারব্যবস্থার দুর্বলতা কমিয়ে আনছে এর কোনো প্রমাণ নেই। নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে এই আইনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ উঠেছে। সাংবাদিকদের কাজের ক্ষেত্র সঙ্কুচিত হয়ে যাচ্ছে বলে সম্পাদক পরিষদ বিবৃতি দিয়েছে; কিন্তু এর অপব্যবহার রোধ হচ্ছে না। সরকারের উচিত এ আইনে হেনস্তা বন্ধে বিশেষ নজর দেয়া; নাগরিক সমাজের সমালোচনা বিবেচনায় নিয়ে আইনটির রদ করা।

লেখকঃ বিশেষ প্রতিবেদক – |
সাবেক কাউন্সিলরঃ বিএফইউজে-বাংলাদেশ ও সদস্য ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন ( ডিইউজে -) ৪ জুলাই ২০২০-|

Share This Post

আরও পড়ুন